সেলিনা পারভীন (৩১ মার্চ ১৯৩১ – ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) ছিলেন এক সাহসী বাংলাদেশি সাংবাদিক, কবি ও মুক্তিকামী নারী, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি তাঁদের মধ্যে একজন শহিদ বুদ্ধিজীবী, যাঁদের ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করেছিল— স্বাধীনতার মাত্র দুই দিন আগে। তাঁর মৃত্যু কেবল এক নারীর নয়, এক জাতির মেধা ও সাহসের হত্যাকাণ্ড ছিল। এই দিনটি পরবর্তীতে শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। জীবদ্দশায় সেলিনা পারভীন কাজ করেছেন সাপ্তাহিক বেগম, সাপ্তাহিক ললনা এবং শিলালিপি-তে। তাঁকে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সেলিনা পারভীন জন্মগ্রহণ করেন নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ উপজেলায় (বর্তমানে লক্ষ্মীপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত)। তাঁর পিতা মো. আবিদুর রহমান ছিলেন এক জনশিক্ষক ও নীতিবান মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁদের ফেনী জেলার বাড়িটি দখল হয়ে গেলে পরিবারটি ফিরে আসে গ্রামে। তখন বারো বছরের সেলিনা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তেন এবং কবিতা ও গল্প লেখায় ছিলেন অনন্য। ছোটবেলা থেকেই তাঁর সাহিত্যপ্রেম ও সৃজনশীল মনোভাব চারপাশের মানুষকে মুগ্ধ করত।
তবে গ্রামীণ সমাজের রক্ষণশীল প্রথার কারণে তাঁর পড়াশোনার ইতি ঘটে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সেই দাম্পত্য জীবন মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং স্বাবলম্বী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নিলেও তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ১০ বছর পর সেই বিবাহের পরিসমাপ্তি ঘটে। নারীর স্বাধীনতা ও আত্মসম্মানের জন্য এই সিদ্ধান্ত ছিল এক সাহসী পদক্ষেপ, যা তাঁকে এক নতুন জীবনের পথে এগিয়ে দেয়।
১৯৫৭ সালে সেলিনা পারভীন তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে নার্স হিসেবে। পরে ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ম্যাট্রন পদে যোগ দেন। ১৯৬০ সালে তিনি আজিমপুর বেবি হোমে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯৬৫ সালে সালিমুল্লাহ অনাথ আশ্রমে কিছুদিন কাজ করেন।
১৯৬৬ সালে সেলিনা পারভীন যোগ দেন সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় সম্পাদকীয় সহকারী হিসেবে। নারীর কণ্ঠস্বর তুলে ধরার এই পত্রিকায় কাজ করতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকতায় দৃঢ় অবস্থান নেন। পরের বছর তিনি সাপ্তাহিক ললনা পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই সময় তিনি একজন রাজনীতিককে বিয়ে করেন এবং মুক্তিকামী কর্মকাণ্ডে আরো গভীরভাবে যুক্ত হন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে তিনি নিজেই ‘শিলালিপি’ নামে একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল সম্পূর্ণ মুক্তিকামী মনোভাবসম্পন্ন। এই পত্রিকায় তিনি প্রকাশ করতেন দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের লেখা— যেমন প্রফেসর মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান ও এ.এন.এম গোলাম মোস্তফা। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে আল-বদর বাহিনীর হাতে নিহত হন।
সেলিনা পারভীন পত্রিকার সামান্য আয় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন— কারো আশ্রয়, কারো খাদ্য, কারো আর্থিক সহায়তা। তাঁর কলম ও সাহসের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার সংগ্রামে এক প্রেরণাদাত্রী নারী।
১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর, যুদ্ধ শেষের মাত্র দুই দিন আগে, আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা সেলিনা পারভীনকে তাঁর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর সাত বছর বয়সী ছেলে সুমন মায়ের অপহরণের সাক্ষী ছিল।
রায়েরবাজার বধ্যভূমির একমাত্র জীবিত সাক্ষী দেলোয়ার হোসেন পরবর্তীতে আদালতে বলেন, বন্দিদের চোখ বাঁধা অবস্থায় তিনি এক নারীর কান্না ও অনুনয় শুনেছিলেন— সেই নারী ছিলেন সেলিনা পারভীন। তিনি হত্যাকারীদের অনুরোধ করেছিলেন, যেন তাঁকে না মেরে ছেড়ে দেওয়া হয়, কারণ তাঁর ছোট ছেলে ছাড়া তাঁর কেউ নেই। কিন্তু নিষ্ঠুর ঘাতকেরা তাঁর আহ্বান উপেক্ষা করে নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করে।
তাঁর দেহে পাওয়া যায় দুটি বেয়নেটের আঘাত— একটি চোখে এবং আরেকটি পেটে— এছাড়াও দুটি গুলির চিহ্ন। তাঁর নিথর দেহটি ফেলে রাখা হয় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে, যেখানে শত শত বুদ্ধিজীবীর দেহ পরে শনাক্ত করা হয়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চৌধুরী মইনুদ্দিন (তৎকালীন লন্ডনপ্রবাসী) এবং আশরাফুজ্জামান খান (যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী)-কে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাঁরা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন— তাঁদের মধ্যে ৯ জন শিক্ষক, ৬ জন সাংবাদিক (যাঁদের মধ্যে ছিলেন সেলিনা পারভীন) ও ৩ জন চিকিৎসক।
আজ সেলিনা পারভীনের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক নন, বরং এক প্রতিরোধের প্রতীক— যিনি কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সত্য, ন্যায় ও স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করেছেন।
সেলিনা পারভীনের জীবন ছিল সংগ্রাম, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি। তিনি দেখিয়েছেন, নারী মানেই দুর্বল নয়— সাহসী চিন্তা, দৃঢ় বিশ্বাস ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই সত্যিকার শক্তি। তাঁর কলমের শক্তি ও আত্মবলিদান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মানবতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১৪ ডিসেম্বর আমরা শুধু একজন শহিদ সাংবাদিককে নয়, বরং এক নারী বীরযোদ্ধাকে স্মরণ করি, যিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন— সত্য কখনও হারায় না।
Last modified: নভেম্বর ১২, ২০২৫