গত ২২ শে কার্তিক, ছিল আমার ৬৮ তম জনন্মদিন। চাকরী হতে অবসর হয়েছি প্রায় ৯ বছর হতে চলেছে। জীবনের অনেকদিন পেছনে ফেলে এসেছি। বয়স বাড়ার সাথে মানুষের অতীত প্রশস্ত হয় আর সংকীর্ণ হয়ে আসে ভবিষ্যত। হারানো দিনের স্মৃতি মনকে আন্দোলিত করে। ভবিষ্যতের সুখ স্বপ্ন দেখার সময়তো আর নেই; ফেলে আসা স্মৃতিতে অবগাহন করে ক্ষনিকের জন্য হলেও মনে সুখ দুঃখের আবহ সৃষ্টি হয়।
আমার জন্ম দুধমুখার পাশ্ববর্তী শরিফপুর গ্রামে। ইয়াকুবপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে প্রাইমারী শিক্ষা শেষ হওয়ার পর ১৯৫৮ সনে দুধমুখা স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হই। ১৯৫৯ সনে আতাতুর্ক হাই স্কুলে চলে যাই।
আমাদের সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রধান্য ছিল। স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল অনেক কম, আমার বাবা আরবী বিষয়ে শিক্ষিত ছিলেন। ভারতের ২৪ পরগনা জেলার একটি প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, হয়ত সে সুবাদে আমাকেও মাদ্রাসার পরিবর্তে স্কুলে ভর্তি করেন। আজ হতে প্রায় ৫৪ বছর পূর্বে আমি দুধমুখা স্কুলের ছাত্র ছিলাম। স্মৃতি হতে অনেক কিছুই মুছে গেছে। সহ-পাঠিদের অনেকের চেহারা মনে পড়ে কিন্তু নাম ভুলে গেছি। এলাকায় তৎকালীন মুরুব্বিদের এবং স্কুল শিক্ষকদের এখন আর কেউ বেঁচে নেই।
বর্তমান দুধমুখা হাইস্কুল সম্ভবত ১৯৪৬ সনের দিকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী হতে যাত্রাশুরু করে ৬ষ্ঠ শ্রেণী খোলার পর এই স্কুলকে ME স্কুল বলা হতো। আমাদের সময়ে জুনিয়র হাই স্কুলে (অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত) উন্নীত হলেও স্কুলের সিলে ME স্কুল লেখা ছিল। তৎকালীন সময়ে জুনিয়র হাইস্কুল একটি টিনের ঘরে ছিল যা বর্তমান ঈদগাহের পশ্চিম দিকে উত্তর দক্ষিণে লম্বা ছিল এবং প্রাইমারী স্কুল বর্তমান মসজিদের উত্তর দিকে পূর্ব পশ্চিমে লম্বা ছিল। বর্তমান ঈদগাহ-সহ উত্তর দিকে ভূঁইয়া বাড়ীর রাস্তা পর্যন্ত ছিল খেলার মাঠ।
জুনিয়র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় জনাব ওয়ালি উল্লাহ। যতদূর জানি তিনি F.A পাশ ছিলেন যা বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক এর সমতুল্য। সম্ভবত আমাদের এলাকায় তিনিই প্রথম F.A. পাশ করেন। জনশ্রুতি ছিল তিনি F.A. পাশ করার পর অনেক দূর দুরান্ত হতে লোকজন তাঁর সাথে দেখা করে সম্মান জানাতে এসেছিলেন। তিনি ইংরেজীতে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। সকল শ্রেণীতে ইংরেজী পড়াতেন। তার লিখে দেয়া Water এর প্যারাগ্রাফ আজও আমার মুখস্ত আছে, সম্ভবত এত ভাল প্যারাগ্রাফ (Paragraph) আমি পরবর্তী সময়ে কোন পুস্তক পাইনি।
অপর শিক্ষক জনাব সেকান্দার আহম্মদ ঐ সময়ে ম্যট্রিক পাশ ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বি-এ পাশ করেন। তিনি প্রায় সকল বিষয় পড়াতেন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল অপরিসীম, জীবনের অনেক চড়াই উত্তাই পার হয়ে তিনি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য ছাত্র জীবন শেষ হওয়ার পর তার সান্নিধ্য খুব কমই পেয়েছি সে কারণে তাঁর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আমার অনেক কিছুই অজানা রয়ে গেছে। মৌলভী মুহাম্মদ উল্লাহ, মৌলভী আলতাফ হোসেন প্রমুখের নাম স্মরণে আছে। বাবু অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে বাবু কামিনী কুমার ভৌমিক, রফিক উল্লাহ, বজলের রহমান, আমিনি কুমার ভৌমিক ও জনাব রফিক উল্লাহ উভয়ে বাংলা পড়াতেন। তাঁদের লেখা পড়া ততদূর ছিল তা জানা নেই তবে শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। বাংলা ভাষায় তাঁদের সেই দখলের দৃষ্টান্ত ছিল বিরল।
জনাব বজলের রহমান (বজপণ্ডিত) ছিলেন অত্যন্ত বয়স্ক লোক। তিনিও বাংলা পড়াতেন। তবে তাঁর ক্লাশ গল্প গুজবেই কেটে যেতো। সব ছাত্ররাই ছিল তাঁর নাতি
অন্য ২ জন শ্রদ্ধেয় মৌলভী মোহাম্মদ উল্লাহ ও মৌলভী আলতাফ হোসেন আরবী উর্দ পড়াতেন। জীবনের বাস্তবতার সাথে তাঁদের পরিচয় ছিল অত্যন্ত নিবিড়। তাই জীবনধর্মী শিক্ষাদান ছিল তাদের ব্রত। উভয়ই ছিলেন হাস্য রসিক
এখানে শিক্ষক হিসেবে আরও ২ জনের নাম উল্লেখ করা না হলে শিক্ষকদের তালিকা অসমাপ্ত থেকে যাবে তাঁরা হলেন জনাব মোস্তাফিজুর রহমান ও জনাব বাচ্চু মিয়া। এই ২ জনই তখন আই-এ ক্লাশের ছাত্র। তারা মাঝে মাঝে আমাদের ক্লাশ নিতেন। অনেক বৃদ্ধ শিক্ষকদের মাঝে দুই তরুন শিক্ষক ছাত্রদের জন্য ছিল কৌতূহল উদ্দীপক।
ঐ সময়ে স্কুল পরিচালনা কমিটি ছিল কিনা তা জানা নেই। তবে শ্রদ্ধেয় মজিবল হক মিয়া স্কুলের সার্বিক বিষয় শিক্ষকদের সাথে আলাপ আলোচনা করে পরিচালনা করতেন।
ঐ সময়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থা আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। অর্থনীতি ছিল কৃষি ভিত্তিক। যাদের চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ বেশী তারাই ছিলেন বিত্তবান। অন্যান্যরা ছিলেন প্রান্তিক চাষী অথবা ক্ষেতমজুর। বিত্তবানদের তালিকায় অধিকাংশ হিন্দু পরিবারই ছিল।
সামাজিক অবস্থায় ধর্মীয় প্রভাব ছিল অপরিসীম। এলাকায় যথেষ্ট হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল। সকলে তাদের ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতেন।
আর্থ মাজিক অবস্থার প্রতিফলন স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের উপর ছিল সুস্পষ্ট। মুসলমান ছাত্ররা সঙ্গি পরে, হিন্দু ছাত্ররা হাফ প্যান্ট পরে স্কুলে আসতো। অপর দিকে মোসলমান শিক্ষা পায়জামা পাঞ্জাবী, অপর দিকে হিন্দু শিক্ষকগণ ধুতী পায়জামা পরে স্কুলে আসা। পোষাকে অর্থনৈতিক অবস্থারও প্রতিফলন ছিল। ভালো জামা কাপড় শুধু মাত্র বিত্ত পরিবারের ছেলেরাই পরতো। অনেক ছেলেরা গেঞ্জি পরে এমনকি খালি গায়েও স্কুলে আসতো। সংসারের কাজে দরিদ পরিবারের ছেলেরা বাবাকে সাহায্য করতে হতো। মোসলমান পরিবারের মেয়ের স্কুলে আসা অনেকটা অপরাধ মনে করা হতো, যে কারণে স্কুলে মুসলিম ছাত্রীর সংখ্যা ছিল না বললেই হয়।
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে হিন্দু পরিবারগুলিতে গান বাজনার ব্যাপক প্রচলন ছিল। স্কুলে প্রতিবছর বার্ষিক অনুষ্ঠান হতো, নাটক ও গান বাজনায় মূলত হিন্দু ছেলেরাই বেশী অংশ গ্রহণ করতো। শেণীতে ভাল ফললাভের জন্য বার্ষিক পুরস্কার দেয়া হতো। পুরস্কার বলতে
গেঞ্জি, খাতা, পেন্সিল ইত্যাদি দেয়া হতো। তৎকালীন সময়ে স্বাধীনতা দিবসে অনেক ঝাকালো অনুষ্ঠান হতো। সব স্কুলে সকাল থেকে বিভিন্ন খেলা ধুলার অনুষ্ঠান হতো। বিকালে মিছিল নিয়ে ছাত্র শিক্ষকগণ দুধমুখা স্কুলের মাঠে হাজির হতো। বিশাল জন সমাবেশে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি স্বাধীনতা দিবসে তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য রাখতেন। বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রগণ অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধর সংগীত পরিবেশন করতেন। এই সব সংগীত ছিল ছাত্র-শিক্ষকদের স্বরচিত।
১৯৫৮-৬৮ তৎকালীন সেনা শাসক আইয়ুব খানের ঘোষিত উন্নয়নের দশক। এর প্রথম বছরে আমি দুধঘমুখা স্কুলের ছাত্র। এলাকায় মনিরুজ্জামান বলে কৃষি বিভাগের এক অফিসার কাজ করতেন যিনি এলাকায় ডেবল সাব নামে পরিচিত ছিলেন। অত্যন্ত অমায়িক এই ভদ্রলোক স্কুলের দক্ষিণ পার্শ্বে ফুল ও পাতা কপির চাষ করান। এই এলাকার লোকজন এর আগে সম্ভবত ফুল ও পাতা কপি দেখেনি। এই প্রদর্শনী সবজির চাষ দেখার জন্য প্রতিনিয়ত ভিড় জমে থাকতো।
দুধমুখা স্কুলের খেলার মাঠে বর্ষাকালে ফুটবল খেলার বিশাল আয়োজন হতো। বিভিন্ন স্কুলের টিম এখানে খেলতে আসতো। বর্ষায় গ্রামের লোকজন ফুটবল খেলা দেখতে আসতেন। দর্শকদের উপছে পড়া ভীড়ে যে অনুপম দৃশ্যের অবতারনা হতো তা আজ কল্পনা করাও কঠিন। স্কুল টীম গুলোর মধ্যে উটার হাট ও বীজবাগ স্কুলের খেলোয়াড়গণ ভালো খেলতেন। আমার সমবয়সী যারা বেঁচে আছেন তাঁদের স্মৃতিতে হয়তো এখনো বীজবাগের খেলোয়াড় মোশারফ ও শঙ্কর-এর কথা মনে আছে।
ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। প্রত্যেক ঋতুতে স্কুলের পরিবেশ বদলে যেতো। বর্ষায় কর্দমাক্ত রাস্তা-ঘাট পেরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ছাত্র-ছাত্রীগণ স্কুলে আসতো। আর্থিক দৈন্যের কারণে ছাতা ক্রয় করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হতো না। মান কচুর পাতা মাথায় দিয়ে অনেককে স্কুলে আসতে দেখেছি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার ফলে আজকের ছাত্র-ছাত্রীগণ হয়তবা তা কল্পনাও করতে পারবে না।
ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড় বলে গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে যে প্রবাদ আছে আজকের নগর ও জনসংখ্যার ভারে তা হারিয়ে গেছে। আজ থেকে ৫৪ বছর পূর্বেকার দুধমুখা বাজার, স্কুল ও আশ পাশের বাড়ীঘর এর যে চিত্র মানষপটে ভেসে উঠে তা ভাষায় ব্যক্ত করার মত যোগ্যতা আমার নেই।
স্কুলের সহপাঠী ও খেলার সাথীরা কে কোথায় আছেন তা জানিনা। অনেকে হয়ত অনেক বড় হয়েছিল কেহ কেহ চির বিদায় নিয়েছেন, দুঃখ দৈন্যে কারো কারো জীবন হয়ত ভারাক্রান্ত যে যেখানেই থাকুক যারা বেঁছে আছেন তাদের কারো সাথে হয়ত পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে দেখা হতে পারে এই প্রত্যাশায় রইলাম।
দীর্ঘ সময় অক্লান্ত পরিশ্রম করে যারা এই মহতী পনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন তাঁদের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
আব্দুল রাজ্জাক
Last modified: নভেম্বর ৩০, ২০২৫