১লা এপ্রিল ১৯৩১ সালে পরশুরাম উপজেলার ফুলগাজী থানার নিলোখী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হাফেজ আহমেদ। পিতার নাম জনাব মুজাফফর আহমেদ। ছোটবেলা থেকেই হাফেজ আহমেদ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহী। তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা ফেনী হাই স্কুল থেকে হয়, যেখানে ১৯৪৭ সালে তিনি ম্যাটিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে ১৯৪৯ সালে আই. এস. সি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে বৃত্তি অর্জন করেন।

১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে বি.এস.সি. অনার্সে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে এম.এস.সি. তে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠা এবং বৈজ্ঞানিক মনোভাব তাঁকে আরও উচ্চতর শিক্ষার দিকে পরিচালিত করে। ১৯৫৯ সালে কলম্বো পরিকল্পনার অধীনে বৃত্তি নিয়ে তিনি ব্রিটেনের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী লাভ করেন।

ডঃ হাফেজ আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর কর্মজীবনের শুরু ১৯৫৫ সালে এবং চলতে থাকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি কলেজে, যেমন রাজশাহী সরকারী কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ, সিলেট সরকারী কলেজ, আজিজুল হক কলেজ বগুড়া এবং ঢাকা কলেজে। শুধু শিক্ষকতা নয়, তিনি অধ্যক্ষের পদেও বহুবার দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২ সালের আগস্ট থেকে ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এ, ডি, পি, আই, ও ডি, ডি, পি, আই (খুলনা ও ঢাকা বিভাগ), শিক্ষা বিভাগের এ, ডি, পি, আই (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), উপসচিব, শিক্ষা মন্ত্রনালয়, শিক্ষা পরিচালক বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমী, ডি পি আই, মহাপরিচালক প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ এবং শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ও, এস, ডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি “নিয়ার” প্রতিষ্ঠানে মহাপরিচালক পদে নিযুক্ত আছেন।

শিক্ষা প্রসার ও গবেষণায় তাঁর অবদান কেবল দেশে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বহুবার দেশ-বিদেশে শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ দেশে-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা এবং সেমিনারে প্রকাশিত হয়েছে।

হাফেজ আহমেদ শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং শিক্ষানীতির উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি টেক্সট বুক বোর্ডের একজন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষার পাশাপাশি জনাব হাফেজ আহমেদ সমাজসেবায়ও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৭৩-৭৪ সালে খুলনা ও ঢাকা বিভাগীয় স্কাউটের আঞ্চলিক কমিশনার, ১৯৭৯-৮২ পর্যন্ত বাংলাদেশ রোভার স্কাউটের আঞ্চলিক কমিশনার, এবং ১৯৮১-৮২ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্কাউটের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর এই সাংগঠনিক ও সামাজিক নেতৃত্ব দেশ ও সমাজে শিক্ষা ও নৈতিকতার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাঁকে “পটি কিউ এ” খেতাব দ্বারা ভূষিত করে।

ডঃ হাফেজ আহমেদ কেবল একজন শিক্ষাবিদই ছিলেন না, তিনি একজন প্রকৃত নেতা, নীতি-নির্ধারক এবং শিক্ষার আধুনিকীকরণে পথিকৃৎ। তাঁর জীবন ও কর্ম দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

হাফেজ আহমেদের জীবন পাঠ, গবেষণা ও প্রশাসনের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধা, নৈতিকতা এবং নেতৃত্বের সম্মিলন ঘটিয়েছে। তাঁর অবদানের কারণে বাংলাদেশে শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window