হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ১৯০৬ সালে তৎকালীন নোয়াখালীর ফেনী জেলার গুথুমা গ্রামে এক সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ নুরুল্লাহ ছিলেন একজন মুনসিফ, যিনি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য পরিচিত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাহার চৌধুরী ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ও সাংস্কৃতিক চেতনায় উজ্জীবিত।
১৯২২ সালে তিনি চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৯২৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতা ছিল তাঁর মানসিক বিকাশের কেন্দ্র, যেখানে তিনি রাজনীতি, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি করেন।
১৯৩৩ সালে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন এবং তাঁর বোন শামসুন্নাহার মাহমুদের সঙ্গে যৌথভাবে “বুলবুল” নামের একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ করেন। সে সময়কার বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় “বুলবুল” ছিল এক নবদিগন্তের সূচনা। এই পত্রিকার মাধ্যমে সাহিত্য, নারীশিক্ষা ও সমাজসংস্কার বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন তারা।
বাহার চৌধুরী শুধু রাজনীতিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক সচেতন চিন্তাবিদ ও প্রগতি-পন্থী লেখক। তাঁর রচনায় দেশপ্রেম, মানবতা, এবং সমাজে ন্যায়ের মূল্যবোধ বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছিলেন — এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
-
“Pakistan” – মুসলিম জাতিসত্তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা।
-
“Mohammad Ali Jinnah” – পাকিস্তানের জনক হিসেবে জিন্নাহর নেতৃত্বের বিশ্লেষণ।
-
“Omar Faruq” – ইসলামের ইতিহাসে এক ন্যায়পরায়ণ খলিফার জীবনকথা।
-
“Ameer Ali” – মুসলিম চিন্তাধারার সংস্কারক স্যার আমির আলির জীবনী ও দর্শন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর যাত্রা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগে এবং ১৯৩৭ সালে নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর দূরদর্শিতা ও প্রখর বুদ্ধিমত্তা তাঁকে দলের অন্যতম মুখপাত্রে পরিণত করে।
১৯৪৪ সালে তিনি মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন — যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাঁর দায়িত্বকালে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক বার্তা ও সংগঠনমূলক কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পরবর্তীতে ফেনী জেলার পরশুরাম আসন থেকে তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি নবগঠিত পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মন্ত্রী হিসেবে তিনি জনগণের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কাজ করেন, বিশেষত তখনকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক হেলথ সেক্টরে আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালে পক্ষাঘাতজনিত অসুস্থতার কারণে তাঁকে মন্ত্রিত্ব থেকে অবসর নিতে হয়।
অবসরের পরও তিনি সাহিত্যচর্চা, সমাজসেবা ও শিক্ষার প্রসারে সক্রিয় থাকেন। তাঁর স্ত্রী আনওয়ারা বাহার চৌধুরী (১৯১৯–১৯৮৭) ছিলেন তৎকালীন নারীদের মধ্যে একজন অগ্রণী সমাজকর্মী ও লেখিকা। তিনি ১৯৬৯ সালে ঢাকায় স্বামী স্মরণে প্রতিষ্ঠা করেন হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, যা আজও রাজধানীর একটি সুপরিচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
এই দম্পতির পাঁচ সন্তান — চার কন্যা ও এক পুত্র। তাঁদের সন্তানরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।
-
সেলিনা বাহার জামান – লেখিকা ও গবেষক
-
শাহিন ওয়েস্টকম্ব – যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কমিউনিটি কর্মী
-
নাসরিন শামস ও তাজিন চৌধুরী – সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত
-
ইকবাল বাহার চৌধুরী – বিটিভির খ্যাতনামা উপস্থাপক, সংবাদ পাঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
বাহার চৌধুরীর পারিবারিক ঐতিহ্যও ছিল অসাধারণ। তাঁর দাদা খান বাহাদুর আব্দুল আজিজ ছিলেন এক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, যিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ফলে সাহিত্য ও সমাজচিন্তার উত্তরাধিকার তিনি পারিবারিকভাবেই পেয়েছিলেন।
হাবিবুল্লাহ বাহার ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব — যিনি রাজনীতি, সাহিত্য, সমাজ ও ক্রীড়াজগতে সমানভাবে অবদান রেখেছেন। তিনি তরুণ বয়সে একজন ক্রীড়াপ্রেমী ছিলেন এবং কলকাতার ক্রীড়াঙ্গনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন।
তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় এক নতুন শিক্ষার বার্তা দেয় — সততা, মানবিকতা ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, “একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক সেই, যিনি দেশের জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিন্তাকে উন্নত করতে কাজ করেন।”
১৫ এপ্রিল ১৯৬৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৬০ বছর। তবে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, লেখনী ও মানবসেবার চেতনা আজও বেঁচে আছে।
হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ছিলেন এক অসাধারণ বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব — রাজনীতিক, সাংবাদিক, লেখক ও সমাজসেবক। তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপ এক উজ্জ্বল ইতিহাসের অংশ, যা আজকের বাংলাদেশে নেতৃত্ব, সংস্কৃতি ও মানবিকতার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। তাঁর নাম শুধু একটি কলেজের সঙ্গে নয়, বরং একটি চেতনার সঙ্গে যুক্ত — স্বাধীন চিন্তার, মানবিক মূল্যবোধের, এবং জাতি গঠনের।
Last modified: নভেম্বর ৬, ২০২৫