বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষি ক্ষেত্রে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের গবেষণা, বিশ্লেষণ ও প্রশাসনিক দক্ষতা দেশের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। হারুন অর রশীদ তাঁদের মধ্যে একজন—একজন উদ্ভাবনী চিন্তাবিদ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অর্থনীতিবিদ এবং নিবেদিত শিক্ষক।

হারুন অর রশীদ ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকে তিনি শিক্ষায় আগ্রহী ও মেধাবী ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভুগোল (Geography) বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের উৎকর্ষতা এবং বৈজ্ঞানিক মননের কারণে তিনি ‘ফেলো অব দি রয়েল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটি’ নির্বাচিত হন—যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর শিক্ষাগত ও গবেষণাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময় তিনি দেশি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে একটি প্রেরণার উৎস ছিলেন। পাঠদানে তাঁর বিশেষত্ব ছিল বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা, বাস্তবধর্মী উদাহরণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তা উদ্দীপনা। তিনি শুধুমাত্র শিক্ষকই ছিলেন না, বরং গবেষক এবং পরামর্শদাতা হিসেবেও দেশের কৃষি অর্থনীতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

১৯৫৯ সালে হারুন অর রশীদ সি.এস.পি. (Civil Service of Pakistan) পরীক্ষায় যোগ দেন। সরকারি চাকরিতে তিনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হন। তাঁর দক্ষতা, দৃঢ় মনোভাব ও নৈতিকতার কারণে তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর বৈজ্ঞানিক ও বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা সরকারের নীতি নির্ধারণে বিশেষ অবদান রাখে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) তে তিনি একজন প্রখ্যাত কৃষি অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখানে তিনি দেশের কৃষি উন্নয়ন নীতি এবং আন্তর্জাতিক কৃষি অর্থনীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পে নেতৃত্ব দেন। তাঁর গবেষণা ও পরিকল্পনা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

এর পাশাপাশি তিনি বিশ্ব ব্যাংকে কাজ করেছেন, যেখানে তাঁর অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও উন্নয়ন প্রকল্পে কাজে লাগানো হয়। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাজ করার সময় তাঁর বিশেষ অবদান ছিল উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় দক্ষতা প্রদর্শন।

হারুন অর রশীদের জীবনপ্রবাহে স্পষ্ট দেখা যায়—শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন মানুষ যদি জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতার সঙ্গে দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করে, তাহলে তাঁর অবদান স্থায়ী হয়ে যায়।

ব্যক্তিগত জীবনে হারুন অর রশীদ ছিলেন বিনয়ী, উদারমনা এবং শিক্ষার্থীদের ও সহকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। সহকর্মীরা তাঁকে স্মরণ করেন একজন বিচক্ষণ পরামর্শদাতা ও মেধাবী নেতা হিসেবে। তাঁর বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিন্তাভাবনা এবং দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মনোভাব তাঁকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

হারুন অর রশীদ আজও বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃষি অর্থনীতি ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে যে, শিক্ষাগত উৎকর্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় একজন ব্যক্তিকে দেশ ও বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপনের ক্ষমতা প্রদান করে।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window